1. admin@newskachua.com : newskachua.com :
  2. mohsinjournalist3@gmail.com : moshin hossain : moshin hossain
  3. rasel@newskachua.com : news kachua : news kachua
  4. shujan@newskachua.com : news chua : news chua
শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ০৮:৪৬ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
পাসপোর্ট অফিসে দালালের দুষ্টচক্র বাংলার আনাছে-কানাছে ছেয়ে গিয়েছে ট্র্যাভেল এজেন্সির কচুয়ায় ৭০ পিস ইয়াবা সহ দুই ব্যবসায়ী গ্রেফতার কচুয়ায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত- ১, থানায় অভিযোগ কচুয়ায় মারামারি মামলা ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন গ্রেফতার কচুয়ার পৌর আ.লীগের সাধারন সম্পাদকের পিতা আর নেই! দাফন সম্পন্ন করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিলেন কচুয়া দুই ওসি কচুয়ায় রহমত উল্যাহ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ইফতার সামগ্রী বিতরণ কচুয়ায় বোরো ধানে স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা বিএনপি নেতা অ্যাড. মুজাম্মেল হোসেনের ইন্তেকাল করোনা মোকাবেলায় ওসি শাহজাহান কামালের ভূমিকা প্রশংসানীয়

বগুড়া জেলা ও উপজেলার নামকরণ এবং প্রাচীন ইতিহাস : মোঃ মহসিন হোসাইন

মোঃ মহসিন হোসাইন
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ২৮২ বার পড়া হয়েছে

বগুড়া জেলার নামকরণের ইতিহাসঃ
১২৭৯ থেকে ১২৮২ কিংবা ১২৮১-১২৯০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের ২য় পুত্র সুলতান নাসিরউদ্দীন বগরা খান বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তাঁর নামানুুসারে বগুড়া জেলার নামকরণ করা হয়েছে। তার মানে, বগুড়া জেলার আরেকটি নাম হল “বগরা”। সুলতান নাসির উদ্দিন বগরা ১২৭৯ থেকে ১২৮২ পর্যন্ত বগুড়া অঞ্চলের শাসক ছিলেন।

বঙ্গদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের স্থানিক নাম ছিল ‘বগ্ড়ী’। সেটা রাজা বল্লাল সেনের আমল। সেই আমলে বঙ্গদেশকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। বঙ্গ, বরেন্দ্র, মিথিলা, বাঢ় ও বগ্ড়ী। শেষোক্ত ‘বগ্ড়ী’ অংশে নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী ‘বাগিদ’দের সংখ্যাগুরুত্ব ও অধিক শক্তিমত্তা ছিল। এই বাগদি শব্দটিই অপভ্রংশ ‘বগ্ড়ী’ রূপ ধারণ করতে পারে। কালে রূপান্তরিত এই ‘বগ্ড়ী’ই ‘বগুড়া’ উচ্চারণে স্থির হয়েছে বলে একটি ধারণা রয়েছে। তবে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ বগুড়ার অবস্থান বঙ্গদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে নয়।

বগুড়া জেলার ইতিহাসঃ
১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত উত্তর বঙ্গের এই অঞ্চলটি প্রশাসনিকভাবে রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। এই তিনটি জেলাই ছিল আয়তনে বিশাল। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী জেলা থেকে আদমদিঘি শেরপুর নৌখিলা ও বগুড়া থানা, রংপুর জেলা থেকে দেওয়ানগঞ্জও গোবিন্দগঞ্জ থানা দিনাজপুর জেলা থেকে লালবাজার, ক্ষেতলাল ও বদলগাছি থানা নিয়ে বগুড়া জেলা গঠিত। এই সময় এই জেলার প্রশাসক হিসেবে জন্য একজন জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়া জেলার প্রায় অর্ধাংশের রাজস্ব সংগ্রহের জন্য এই জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে ক্ষমতা দেওয়া হয়। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী জেলার রায়গঞ্জথানা বগুড়া জেলার অধীনে আনা হয়। এই পদ্ধতিতে বগুড়ার রাজস্ব আদায় সুসম্পন্ন করায় ব্যাঘাতের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন বগুড়ার পূর্ব-প্রান্তের ব্রহ্মপুত্র নদের পার্শ্ববর্তী ৮০ মাইলের ভিতরের সকল জমিদারের খাজনা বোয়ালিয়ার সরকারী কোষাগারে জমা হতো। আবার তৎকালীন বগুড়া শহর থেকে ১২ মাইল দূরের দাওকোবার রাজস্ব জমা হতো ময়মনসিংহের সরকারি কোষাগারে। জমিদারদের রাজস্ব জমার অসুবিধার জন্য, কিছুদিনের জন্য নিয়ম করা হয়েছিল যে, জমিদাররা, বোয়ালিয়া, বগুড়া ও ময়মনসিংহের যে কোনো রাজস্ব অফিসে তাদের রাজস্ব জমা দিতে পারবে।

এই নিয়ম প্রচিলত হওয়ার পর দেখা গেল, স্থানীয় অধিকাংশ জমিদার বগুড়া কোষাগারে রাজস্ব জমা দিচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের এই বিষয়টি বিবেচনা করে, ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ময়মনিসংহ ও রাজশাহী জেলা থেকে ৫৪৯টি জমিদারি বগুড়া কালেক্টরের অধীনে আনা হয়। উল্লেখ্য এর আগে বগুড়ার অধীনে ২৮৭টি জমিদারি ছিল। এরফলে বগুড়ার প্রশাসনিক আয়তন বৃদ্ধি পায়। ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে দাওকোবা নদীর বিশাল আকার ধারণ করে। এর ফলে রাজস্ব আদায়ে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে এ বিষয়ে তদন্তের জন্য দেওয়ানি আদালেতর মিলস নামক একজন জজকে পাঠানো হয়। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জানুয়ারি তারিখে তৎকালীন ভারত সরকারের আদেশ অনুযায়ী দাওকোবা নদী বগুড়া জেলার পূর্বসীমা নির্ধারিত হয়। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে বাউন্ডারি কমিশনারের নির্দেশানুসারে বগুড়া জেলার দক্ষিণ সীমানার কিছু অংশ রাজশাহী জেলার অন্তর্গত হয়। এই সময় ক্ষাদ্র ভাদাই বা ভাদ্রাবতী নদীকে বগুড়ার সীমানা নির্ধারিত। এই বৎসরের ১২ই আগষ্ট বগুড়ার গোবিন্দগঞ্জ থানাকে রংপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সময় ১০২টি গ্রামকে গোবিন্দগঞ্জ থানার অধীনে নেওয়া হয় এবং এই থানার ৯টি গ্রামকে বগুড়া থানায় রাখা হয়।

এছাড়া ৪৭টি গ্রামকে শিবগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই মার্চে লালবাজার থানাকে পাঁচবিবিতে স্থানান্তর করা হয়। ২০শে মার্চ মানাস নদী মজে যাওয়ায় কারণে নৌখিলা থানাকে সারিয়াকান্দির সাথে যুক্ত করা হয়। এরপর ৮ অক্টোবরে, বগুড়া জেলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের রায়গঞ্জথানাকে পাবনা জেলার সীমা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এক্ষেত্রে মধ্যবর্তী সীমানা হিসেবে ইছামিত নদীকে রাখা হয়। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই সেপ্টেম্বরে ৪৩৯টি গ্রাম ময়মনিসংহ জেলা থেকে নিয়ে বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানার সাথে যুক্ত করা হয়। এই বৎসর শিবগঞ্জথানা বগুড়া থানার আউট পোষ্টে পরিগণিত হয়। ১৮টি নতুন গ্রাম যুক্ত হওয়ায় শিবগঞ্জথানাকে পূর্ণাঙ্গ থানায় পরিণত করা হয়। ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়া জেলার একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং একজন কালেক্টরের শাসনাধীনে আনা হয়। এই নিয়োগের ফলে বগুড়া একটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় পরিণত হয়।

এছাড়াও বগুড়ার প্রাচীন নাম বরেন্দ্রভূমি ও পৌ-্রবর্ধন। আজকের রাজশাহীও এই অঞ্চলভুক্ত ছিল। অঞ্চলটি ৯ থেকে ১২ শতক সেন রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। পরে ১৩শ শতকের শুরুতে তা মুসলিম শাসকদের অধীনে আসে। ১৩শ শতকের শুরুতে এই এলাকা মুসলিম শাসকদের হাতে যায়। তারপরও সেন বংশের নৃপতিরা সামন্তপ্রধান হিসাবে প্রায় ১০০ বছর শাসনকার্য চালায়। এরপর অচ্যুত সেনের আচরণে রাগান্বিত হয়ে গৌড়ের বাহাদুর শাহ (১৫৩৭) সেনদের বিতাড়িত করেন।

এদিকে ১৭৬৫ সালে মোঘল স¤্রাটের নিকট হতে ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার (এই অঞ্চল) দিওয়ানি গ্রহণ করে। হযরত সুলতান বলখী মহিউদ্দিন মাহীসওয়ার এই এলাকায় ধর্ম প্রচার করেন। করতোয়া নদীর তীরে ইংরেজরা ১৮২১ সালে বগুড়া জেলার পত্তন ঘটিয়েছিল, এই জনশ্রুতি এবং অনুমান দ্বিধামুক্ত না হলেও উপাত্তটি একেবারে আমলের বাইরে রাখা যায় না। মূলত এই অনুমানের ২৮ বছর পরে, ১৮৫৯ সালে বগুড়া জেলা গঠিত হয়। যদিও ১৮২১ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা বগুড়া শহরের গোড়পত্তন ঘটেছিল।

দিল্লীর সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন (১২৬৫-৮৭) এর সেনানায়ক। এই সেনানায়কই বাংলাকে দেখাশোনার জন্য সুলতান গিয়াস উদ্দিন কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে এসেই তুঘরিল খাঁ বিদ্রোহ করেন এবং নিজেকে বাংলার শাসক ঘোষণা করেন। গিয়াস উদ্দিন তখন তার কনিষ্ঠ পুত্র বগ্রা খাঁ-কে দিয়ে ঐ বিদ্রোহ দমনার্থে অভিযান পরিচালনা করেন। বগ্রা খাঁ সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করে তুঘরিলকে পরাজিত ও হত্যা করেন। এই অভিযানে বিজয় অর্জনের পর সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন লক্ষণাবতী, বাংলা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার শাসনাধিপতি সরূপে বিজেতা শাহজাদা বগ্রা খাঁকে নিযুক্ত করেন। এই বগ্রা খাঁ-র মূল নাম ছিল নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪১১)। ইনি ছিলেন বড় প্রমোদন্মত্ত, জলসাপ্রিয় এবং পানাসক্ত। পিতা গিয়াস উদ্দিন বলবন শাহ শাসনকার্যে নিযুক্তি দিয়ে পুত্রকে সত্যনামা ও শপথ পাঠ করান যে, বাংলার সমগ্র অঞ্চলে বলয় বিস্তারের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নাচ-গানের জলসায় যাবেন না। এই সময় আলোচ্য বগ্রা খাঁ-র নামানুসারে প্রাচীন পু-্রনগরের পাশে একটি শহর গড়ে তোলা হয়। ষোড়শ শতাব্দীর ৪ এর দশকে করতোয়া নদীর তীরে গড়ে তোলা এই শহরেরই নাম বগুড়া।

মোঘল আমলে পূর্বে কিছুকাল এবং সুলতানি আমলের পর, এই করতোয়াবর্তী শহরের বিস্তার-প্রসার স্তিমিত হয়ে পড়ে। উক্ত জমিদারদের সময়ে নতুন করে পুনরায় নগররূপে তা উদ্ভাসিত হতে থাকে। ব্রিটিশ আমলে মহকুমা এবং ১৮২১ সালে এই মহকুমাকে ‘বগুড়া জেলা’ হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন, পূর্ব পাকিস্তানের শেষ দিকেও বগুড়ার বানান ‘বগ্রা’ লেখা হতো। বলা যায় পাকিস্তানের শেষে এসে ‘বগ্রা’ ‘বগুড়া’ হয়ে যায়। লক্ষণীয়, ‘বগুড়া’র ইংরেজি বানান এখনও অবিকল ‘বগ্রা’ই (ইড়মৎধ) রয়ে গেছে।

বগুড়া জেলার হিন্দু আমলঃ
বগুড়া হিন্দু আমলে ১১৩৪ খৃস্টাব্দ থেকে ১১৮৭ খৃস্টাব্দের মধ্যে দু’জন কবির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। গৌড়ের রাজা মদন পালদেবের সময়ে কবি সন্ধ্যাকার নন্দীর জন্মস্থান উল্লেখ করেছেন মহাস্থান সন্নিকটবর্তী পৌন্ড্রবর্ধনপুর। তার পিতা কায়স্তদের অগ্রণী ছিলেন। তার পিতার নাম প্রজাপতি নন্দী বলে উল্লেখ করেছেন ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার। পিতা নাম ছিল পিনাক নন্দী। আর সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল ‘রামচরিয়তম’। শিবগঞ্জ থানার বিহার গ্রামে জন্মস্থান করেছেন অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য। তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল ‘হারলতা’। রমেশ চন্দ্র মজুমদারের আরেকটি গ্রন্থে ছিল নাম ‘পিতৃদয়িতা’। ঐতিহাসিকগণের মতে তিনি রাজা বল্লাল সেনের সাহিত্যগুরু ছিলেন।

বগুড়া জেলার সুলতানী আমলঃ
বগুড়া সুলতানী আমল ১৪০৮ সালের দিকে উদয়নাচার্য ভাদুড়ী নামে একজন গ্রন্থকারের পরিচয় পাওয়া যায়। ভাদুড়ী জন্মগ্রহন করেছিলেন কাহালু থানার নিশিন্দ্রা গ্রামে। কেউ কেউ বলেন, ভাদুড়ী নন্দীগ্রাম থানার নিশিন্দারা গ্রামে জন্মেছিলেন।

বগুড়া জেলার নবাবী আমলঃ
নবাবী আমল ১৫৭৬ খৃস্টাব্দের সময় বগুড়া জেলায় বেশকিছু কবি সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটে ছিল। তাদের ভিতরে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন গদাধর ভট্টাচার্য, রামনারায়ণ ভট্টাচার্য, নিত্যানন্দ আচার্য, কবি বল্লভ এবং জীবনকৃষ্ণ চৈত্র। প্রভাস সেনের গ্রন্থে তাঁর নাম গঙ্গাধর ভট্টাচার্য কিন্তু কে. এম. মেছেরের গ্রন্থে গদাধর ভট্টাচার্য বলা হয়েছে। গদাধর ভট্টাচার্য লক্ষীচাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেছেন। তাঁর ২টি গ্রন্থের নাম হলঃ ‘ব্রহ্মনির্ণয়’ ও ‘গদাধরী টীকা’ এবং ‘কৃতভাষ্য’ তাঁর রচনাকর্ম। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় তিনি এই কাব্যটি রচনা করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থটি এত দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, কবি বল্লভ ‘রসকদম্ব’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।ন মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে কবি জীবনকৃষ্ণ মৈত্র সবেচেয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি মহাস্থানের লাহিড়ীপাড়া গ্রামের কবি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মনসা মঙ্গলের কবি হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। জীবনকৃষ্ণ মৈত্রের কাব্যের নাম ‘পদ্মপূরাণ’।

বগুড়া জেলার বৃটিশ আমলঃ
বৃটিশ আমলে বগুড়াতে কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণার ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৪৮ খৃস্টাব্দের পরবর্তী সময় পর্যন্ত যে সমস্ত কবি-লেখকরা নিজেদের রচনাকর্মের দ্বারা খ্যাতি অর্জন করেন তাঁদের মধ্যে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম লেখকদের অবদানও কম ছিল না। বৃটিশ আমলের মধ্যপর্যায় থেকে যাঁরা সাহিত্য রচনা শুরু করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- হরগোপাল দাস কুন্ডু, প্রাণগোবিন্দ দেব, প্রভাসচন্দ্র সেন, কাজী কলিমুদ্দিন, দেববর্শন বিএল, সারদানাথ খাঁ বিএল, মুনশী হামেদ আলী শহরউল্লা, সৈয়দ বাহার উদ্দিন, কোববাদ হোসেন, ডাঃ কহরউল্লা।

বগুড়া জেলার দর্শনীয় স্থান সমূহ- মানকালীর কুন্ড ধাপ, বিহার ধাপ, পরশুরামের প্রাসাদ, বেহুলা লক্ষিণদ্বরের বাসর ঘর (গোকুল মেধ), খেরুয়া মসজিদ, ভীমের জাঙ্গাল, যোগীর ভবন, ভাসু বিহার, পাঁচপীর মাজার, সারিয়াকান্দির পানি বন্দর, বাবুর পুকুরের গণকবর, জয়পীরের মাজার, সান্তাহার সাইলো, দেওতা খানকাহ্ মাজার শরীফ, হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী মাহীসওয়ার (রহঃ) মাজার শরীফ, শীলাদেবীর ঘাট, জিউৎকুন্ড, মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, গবিন্দ ভিটা।

বগুড়া জেলার নদ-নদী সমূহ করতোয়া নদী, যমুনা নদী, বাঙ্গালী নদী, নাগর নদী, হলহলিয়া নদী, ইছামতি নদী, মহিষাবান নদী, সুখদহ নদী, ডাকুরিয়া নদী, বেলাই নদী, ভাদাই/ভদ্রাবতী নদী, চন্দ্রবতী নদী, গাংনই নদী, গজারিয়া নদী, মানস/মোনাস নদী, বানিয়াইয়ান নদী, ইরামতি নদী, ভেলকা নদী।

বগুড়া জেলার উপজেলা সমূহ কাহালু উপজেলা, বগুড়া সদর, সারিয়াকান্দি, শাজাহানপুর, দুপচাচিঁয়া উপজেলা, আদমদিঘি উপজেলা, নন্দিগ্রাম, সোনাতলা উপজেলা, ধুনট উপজেলা, গাবতলী, শেরপুর উপজেলা, শিবগঞ্জ।

১. কাহালু উপজেলা- জানা যায় দরবেশ গাজী জিয়া উদ্দীন সাহেবের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হযরত শাহ সুফী সৈয়দ কালু নামের এক দরবেশ এসে বর্তমান কাহালু থানার পার্শ্বে আস্তানা স্থাপন করেন। এখান থেকে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে থাকেন এবং এখানেই তিনি মৃত্যুবরন করেন। কাহালু থানার অভ্যন্তরে এই দরবেশের মাজার রয়েছে যা কালু বাবার মাজার নামে পরিচিত। এ সাধু পীরের নামানুসারে উপজেলার নামকরন হয়েছে‘‘কাহালু’’ বলে জনশ্রুতিতে প্রকাশ।

২. সারিয়াকান্দি উপজেলা অতীতে নাম ছিল নওখিলা। মনসা নদী মজে যাওয়ার দরুন তৎকালীন নওখিলা থান সদর সারিয়াকান্দি নামে গ্রামে স্থানান্তরিত করা হয়।

৩. শাজাহানপুর উপজেলা- জনশ্রুতিতে রয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীতে করতোয়া নদী পথে মাঝে মাঝে মধ্য রাতে মাছ ধরা মাঝির বেশে জলদস্যুরা আসতো। এ অঞ্চলে লুটতরাজ করতো। ফলে সমস্ত এই জনপদের নাম হয়ে পড়ে মাঝিড়া। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সুবে-বাংলা এ সমস্যার কথা পত্রযোগে আগ্রাতে সম্রাট শাজাহানকে অবহিত করলেন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে সেনা ছাউনি সহাপনের জন্য এখানে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। মোঘল সেনাদল এই উপজেলা সদরের ৭০০ গজ উত্তরে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পূর্ব পাশে ২৫/৩০ ফুট মাটি ভরাট করে সহানটিতে উঁচু ঢিবি তৈরি করে সেনা ছাউনি সহাপন করা হয়। যাতে সেই উঁচু ঢিবি হতে দিগমত বিসতৃত অঞ্চলে জলদস্যুদের যে কোন আনাগোনা বা গতিবিধি লক্ষ্য করা যায়। ধার্মিক সম্রাটের বদান্যতায় এই জনপদের মানুষ সন্ত্রাস আর দস্যুতা হতে পরিত্রাণ পায়। মোঘল সম্রাটের নাম অনুসারেই পুরো এলাকার নাম হয় শাজাহানপুর বা সাজাপুর। বৃটিশ আমল থেকে সকল রেকর্ড পত্রে মৌজাটির শাজাপুর নাম বহাল রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ উপজেলার নাম হয় শাজাহানপুর উপজেলা।

৪. দুপচাঁচিয়া উপজেলা- এক সময় এ উপজেলায় তাঁত শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। তখন ‘ধূপছায়া’ নামে এক ধরণের উন্নতমানের দামী তাঁতের শাড়ি তৈরী হতো। এই ‘ধূপছায়া’ শাড়ী হতেই এ থানার নাম হয় ধূপছাঁচিয়া। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনামলে তাঁত শিল্পকে গুরুত্ব দিয়েই দুপচাঁচিয়া সদরে তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যা সরকার নিয়ন্ত্রিত ছিল। উক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রথমে বাঙ্গালী খ্রিষ্টিয়ানগণ প্রশিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে মুসলমান প্রশিক্ষক উক্ত তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চাকুরি করতেন, তাদের বংশধর এখনো দুপচাঁচিয়ায় রয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলতেন, এককালে হিন্দু প্রধান এলাকা হিসাবে এখানে প্রচুর ধোপী (ধোপা) শ্রেণির লোক বাস করতেন। সদরের পাইকপাড়া থেকে মাঝিপড়া হয়ে মহলদার পাড়ার মধ্য দিয়ে দুপচাঁচিয়া পাইলট হাই স্কুলের পশ্চিম ও দক্ষিণ পার্শ্বে মরাগাংগী নামক খাল ছিল। ধোপারা এখানে তাদের কাপড় ধোয়া ও শুকানোর কাজ করতেন। এই ধোপী বা ধোপা কথাটি থেকেই কালক্রমে এই এলাকার নামকরণ হয়েছে ধোপচাঁচিয়া। অনেকে বলেন প্রাচীনকালে এ এলাকায় ধূপের চাষাবাদ ছিল। তা থেকে ধূপচাঁচিয়া। যা পরবর্তীতে দুপচাঁচিয়া নামে পরিচিতি পায়। ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে শের খাঁর আমলে ভূমি জরিপ ও মৌজার নামকরণ প্রথম শুরু হয়। তখন থেকেই দুপচাঁচিয়া মৌজার সৃষ্টি হয়েছে বলে কথিত রয়েছে।

৫. আদমদীঘি উপজেলা- হযরত বাবা আদম (রঃ) এর পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত এ আদমদীঘি উপজেলা। ইতিহাস থেকে জানা যায় রাজা বল্লাল সেনের রাজত্বকালে উক্ত সুফি সাধক এর শুভ পদার্পণ ঘটে। তিনি এ অঞ্চলে দীর্ঘকাল অবস্থান করেন এবং ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে জনকল্যাণে বৃহদাকার দীঘি খনন করেন। হযরত বাবা আদম (রঃ) এর খননকৃত দীঘির নাম অনুসারে এ অঞ্চল পরবর্তীতে ‘‘আদমদীঘি’’ নামে পরিচিতি লাভ করে। নাটোরের মহারাজার মহিয়সী পত্নী রানী ভবানীর জন্মস্থান এ আদমদীঘি উপজেলার ছাতিয়ানগ্রামে।

৬. নন্দীগ্রাম উপজেলা- পূর্বে নন্দীগ্রাম নাটোরের সিংড়া থানার অধীনে ছিল। কিংবদন্তী থেকে জানা যায়, রাজা দশরথের দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাইয়ের নাম ছিল নন্দিনী। তিনি একদা এ অঞ্চলে বাস করতেন। বলা হয়, নন্দিনীর নামানুসারে নন্দীগ্রাম হয়েছে।

৭. সোনাতলা উপজেলা- সোনাতলা মৌজার নামানুসারে সোনাতলা উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে।

৮. ধুনট উপজেলা- ১৮ শতকের শুরুর দিকে যমুনা নদীতে একটি চর জেগে উঠলে দুধর্ষ ডাকাতদের একটি দল এইরে চরে আস্তানা গাড়ে। এই ডাকাতরা নদীপথে চলাচলকারী যাত্রীদের নিকট থেকে ধন-সম্পদসহ সর্বস্ব লুট করে নিতো। সময়ের বিবর্তনে এই চর এলাকা ধন-লুট নাম পরিচিত লাভ করে, যাক এক পর্যায়ে লোকমুখে ধুনট হয়ে যায়।

৯. গাবতলী উপজেলা- গ্রামের প্রায় মাঝামাঝি মসজিদের কাছে রাস্তার বাম পাশে একটি প্রকান্ড কিন্তু নেড়ে ডাল-পালা নেই বললেই চলে এমন পুরাতন গাব গাছ। যে গাব গাছের নাম অনুসারেই গাবতলী গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে। এককালে গাবতলী এলাকায় প্রচুর গাব গাছ ছিল, যার নিদর্শন এখনও দেখা যায় গাবতলী গ্রামে।

১০. শেরপুর উপজেলা- মোঘল আমলে এ অঞ্চল কে বলা হতো ‘শেরপুর মুরচা’। আইনই-আকবরী ও আকবরনামা উভয় গ্রন্থেই এ স্থানের নাম শেরপুর মুরচা। বৃহত্তর শেরপুর থেকে এ স্থানকে আলাদাভাবে পরিচিত করার উদ্দেশ্যেই সম্ভবত ‘মুরচা’ নাম যোগ করা হয়েছিল। ফারসী মুরচা শব্দের অর্থ দুর্গ বা গড়।

১১. শিবগঞ্জ উপজেলা- শিবগঞ্জ উপজেলা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। পূর্বে এ এলাকায় হিন্দুদের পুজাপার্বনে অসংখ্য শিবমন্দির ছিল। শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে বন্দর-গঞ্জ গড়ে উঠে। এরই ফলশ্রুতিতে এ উপজেলার নাম শিবগঞ্জ করা হয়েছে ।

লেখক পরিচিতিঃ
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন

ওয়েবসাইট নকশা প্রযুক্তি সহায়তায় : মাল্টিকেয়ার

প্রকাশিত/প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র,ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।